গাজায় হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ

আজকের খবর ইবি
রানা আহম্মেদ অভি, ইবি প্রতিনিধি:
ফিলিস্তিন, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও ভারতে মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলে উত্তাল কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। বর্বর এই হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানিয়ে শুক্রবার (২১ মার্চ) জুম্মার নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসন ভবন সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে শিক্ষার্থীরা— “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার!” “বিশ্বের মুসলিম, এক হও লড়াই করো!” “ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন!” “একশান টু একশান, ডাইরেক্ট একশান!” “বদরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার!” “উহুদের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার!” “জিহাদ, জিহাদ, জিহাদ চাই, জিহাদ করে বাঁচতে চাই!” “ফিলিস্তিনের কারণে, ভয় করিনা মরণে!” “বয়কট, বয়কট, ইসরায়েল বয়কট!” “রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়!” ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।
এসময় শিক্ষার্থীরা বলেন, “ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর আক্রমণে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন। যারা মানবতার কথা বলে, তারাই আজ বর্বরতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমা মানবতাবাদীরা সব জায়গায় মানবতার ফাঁকা বুলি আওড়ান, অথচ ফিলিস্তিনের বেলায় তাদের মানবতা কাজ করে না। ফিলিস্তিনিদের এই ন্যায্য অধিকারের বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করছে না। অবিলম্বে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ইসরায়েলি বর্বর হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। এই নির্মম গণহত্যা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতাদের অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।”
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ইবির সভাপতি ইসমাঈল রাহাত বলেন, “এই ক্রান্তিলগ্নে আমরা সুন্দরভাবে চলাফেরা করতে পারলেও আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনেরা সাহরি ও ইফতারটাও স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারছে না। তাদের ঘুম ভাঙে বোমার আওয়াজে। বিশ্ব মুসলিম নেতাদের বলতে চাই, আমরা সাধারণ মুসলিমরা প্রস্তুত আছি, আপনারা ঐক্যবদ্ধ হন এবং ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ান। এই আক্রমণ অবশ্যই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়েছে। জানুয়ারির যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি ছিল প্রতারণার অংশ। সেই চুক্তি ফিলিস্তিনিদের যুদ্ধের গতি দমিয়ে দিয়েছে। বিশ্ব মুসলমানদের আহ্বান জানাই—আসুন, আমরা এক হই, ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াই।”
সহ-সমন্বয়ক নাহিদ হাসান বলেন বলেন, “গাজা খুব বড় একটা জায়গা না। মাত্র ৩৪০ বর্গ কিলোমিটারের একটি এলাকা। আরো একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন, ঢাকা হচ্ছে ৩০৪ বর্গ কিলোমিটার। সে হিসেবে গাজা ঢাকা থেকে অল্প একটু বড় এলাকা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই মুসলমানদেরকে কতটা আত্মিক শক্তি দিলে ঢাকার মতো একটি এলাকা ইসরায়েল অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়েও পুরো ধ্বংস করতে পারেনি। সুতরাং, যে মহান রব্বুল আলামীন মাত্র দুটি ঘোড়া দিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে বদর যুদ্ধে একহাজার সশস্ত্র কাফেরের বিরুদ্ধে জয়লাভ করিয়েছিলেন, যে মহান রব্বুল আলামিন ছোট্ট এই গাজাকে শক্তিশালী আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকার সক্ষমতা দিয়েছেন, তিনি এই ফিলিস্তিনকে বিশ্বের বুকে দাঁড়াতে দেবেন ইন শা আল্লাহ।
তিনি বলেন, আমরা দেখি, সারা বিশ্বে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে, দু-একজন নেতার কথা ছাড়া কেউ তেমন ভূমিকা নিতে পারে না। সারা বিশ্ব, ওআইসি, ইউনাইটেড নেশনস বিভিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানদের ওপর আক্রমণের প্রতিক্রিয়া দেখালেও, যখন গাজা আক্রমণ হয়, তখন তাদের প্রকাশ্য মদদে গাজার মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করা হয়। তার প্রমাণ, গত দিন ইসরায়েল গাজাবাসীর ওপর আক্রমণ করে, আমেরিকা স্বীকার করেছে যে তাদের অনুমতিক্রমে গাজাবাসীর ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। এই ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা জানিয়েছে, সেখানে তারা বিনোদন কেন্দ্র করতে চায়। সে লক্ষ্যে তারা গাজাবাসীকে উচ্ছেদ করে ছাড়বে।
নাহিদ বলেন, “যদি এই মুসলমানদেরকে রক্ষা করতে হয়, মুসলমান আমরা যেখানে যেভাবেই আছি, সকলকে এমনভাবে আওয়াজ তুলতে হবে, যাতে গাজাবাসীকে রক্ষা করতে ও নিরাপত্তা দিতে ইসরায়েল বাহিনী বাধ্য হয়। মহান রব্বুল আলামিনের কাছে আমি এই দোয়া করি— হে আল্লাহ, আমরা জানি, এটা মুসলমানদের ওপর হয়তো তোমার গজব অথবা তোমার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। যদি গজব হয়ে থাকে, তুমি আমাদেরকে পানাহ দাও। যদি পরীক্ষা হয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে সে পরীক্ষা থেকে উত্তীর্ণ হতে পারব, তার তৌফিক আমাদেরকে দাও। যদি এই গাজাবাসীর পক্ষে ন্যূনতম একটি ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে, সে ভূমিকা রাখার তৌফিক আমাদের দাও। আমাদের ঈমানকে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আবারও পরীক্ষা দিতে চাই, মুসলমানদের ওপর একটি আঘাত আসলে আমরা বসে থাকব না ইন শা আল্লাহ।”— বলে নাহিদ হাসান জানান।
সমন্বয়ক এস এম সুইট বলেন, “ইসরাইলকে সমর্থন দিচ্ছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিচ্ছে ভারত। আমরা এখান থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু করতে পারবো না। কিন্তু আমাদের যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত রয়েছে, সেই দেশের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার থাকতে হবে। একইসাথে আওয়ামী লীগের বিষয়ে আমাদের অবস্থান এক থাকতে হবে।”
সুইট বলেন, “ইসরাইলের নেতানিয়াহু এবং বাংলাদেশের শেখ হাসিনা একই সূত্রে গাঁথা। তাঁদের সাথে ভারতের সম্পর্ক, তাদের সাথে ইসরাইলিদের সম্পর্ক। ফিলিস্তিন ও সারাবিশ্বের মুক্তিকামী জনতার মুক্তি দ্রুত হোক—এই কামনা করছি।”
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক ইউসুব আলী বলেন, “গত ১৭ রমজান গাজায় হামলার পর ফ্যাসিস্ট নেতানিয়াহু বলেন, হামলা কেবল শুরু। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিতে চাই, এটা হামলা শুরু নয়, এটা তোমার পতনের শুরু। আমাদের বাংলাদেশের একজন মুসলিম নেতা হামাসের নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা তাকে বলেছে, সম্মুখ যুদ্ধে তারা একজন যোদ্ধাকেও শহীদ করতে পারেনি। যখন সম্মুখ যুদ্ধে হত্যা করতে পারেনি, তারা বিভিন্নভাবে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে নারী ও শিশুদের হত্যা করছে।”
তিনি বলেন, “আপনাদের থেকেও আরও শক্তিশালী ছিল ফেরাউনের সম্প্রদায়, নমরুদের সম্প্রদায়, কিন্তু তারা এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারেনি। আমরা দেখছি, আজ বিশ্ব মানবতা চুপ হয়ে আছে। যারা জাতিসংঘের নামে মানবতার কথা বলে, মানবতা হচ্ছে অমুসলিম মানবতা। মুসলমানদের ওপর তাদের কোনো মানবতা আমরা দেখি না। আমরা স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই, যদি আপনারা এই দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করেন, তাহলে আপনাদের ধ্বংস অনিবার্য। আমি বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই—আর কতদিন এভাবে সহ্য করবেন? আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব আসার আগেই আপনারা সাবধান হয়ে যান।”
শেষে শিক্ষার্থীরা ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়ে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ করেন।
শেয়ার করুন